২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে ফের শুরু হয়েছে মেরুকরণ। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংস্কার প্রক্রিয়া এখন প্রবেশ করেছে নির্বাচনী রূপান্তরের পর্যায়ে। রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনো না এলেও দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে এজেন্ডা, আসন সমঝোতা ও কৌশল নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি—এই তিন ইস্যুকে ঘিরেই এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাচন। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই তিন শিবিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
বিএনপি-কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক ঐক্য শিবির
বিএনপি এখনো বৃহত্তম বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নির্বাচনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। দলটি ঘোষণা করেছে—জুলাই সনদের যেসব অংশে তারা স্বাক্ষর করেছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবে, তবে অন্য অংশের দায় তারা নেবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ভোট এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই তাদের মূল লক্ষ্য। বিএনপি বর্তমানে নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম ও দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা করছে একটি “গণতান্ত্রিক ঐক্য ফ্রন্ট” গঠনের বিষয়ে।
জামায়াত-কেন্দ্রিক ইসলামী ও মধ্যপন্থী জোট
জামায়াতে ইসলামী জুলাই আন্দোলনের পর রাজনীতিতে নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছে। তারা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোটসহ ৮টি দলের সঙ্গে “ইসলামী ও মধ্যপন্থী ঐক্যজোট” গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই জোট গণভোটসহ ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছে। তাদের মূল ফোকাস হলো—জুলাই সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং একটি অবাধ, বাধাহীন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা।
এনসিপি-কেন্দ্রিক নাগরিক জোট
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেকে ‘তৃতীয় বিকল্প শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তারা বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও এখনো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। এনসিপি বলছে, সংবিধান সংশোধন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছাড়া কোনো নির্বাচন অর্থবহ হবে না। তাদের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে গণঅধিকার পরিষদ ও আমার বাংলাদেশ পার্টির নাম শোনা যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ
ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখন দ্বিমুখী চাপে—একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া, অন্যদিকে প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি করেছে এবং ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে।
বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে দলীয় সভা, মিছিল ও প্রচারণা জোরদার হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দুই ভাগে বিভক্ত—একদিকে সংস্কারপন্থী শক্তি, অন্যদিকে পুরনো ক্ষমতাকাঠামোর দলগুলো।
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে বাংলাদেশের “ট্রানজিশন পলিটিক্স”-এর প্রথম পরীক্ষা। এই ভোট কেবল সরকার গঠনের নয়, বরং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোর বৈধতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। যদি সব দল অংশ নেয়, তাহলে এটি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার সূচনা হতে পারে; তবে একতরফা নির্বাচন হলে আবারও অস্থিরতা ফেরার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ এখন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে—একদিকে স্থিতিশীল সংস্কারের পথ, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার রাজনৈতিক ঝুঁকি। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রূপরেখা।
