গত তিন দশকে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও একজন তাঁতিকেও পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্বাসন করতে পারেনি বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড (বাতাঁবো)। অথচ এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৪৩২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ১৬৫ একরের বেশি জমি কোথাও অনাবাদি পড়ে আছে, কোথাও সবজি চাষ হচ্ছে, আবার কোথাও কেবল সাইনবোর্ডই দৃশ্যমান। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে তাঁতিরা বোর্ডকে দোষারোপ করছেন, আর বোর্ড দায় চাপাচ্ছে তাঁতিদের অনীহার ওপর।
রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেকে বেনারসিপল্লির তাঁতিদের পুনর্বাসনে ১৯৯৫ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়, যা শেষ হয় ২০০৭ সালে। এতে ব্যয় হয় ১৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। পুনর্বাসনের জন্য ৪০ একর জমি বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে তাঁত বোর্ডের দখলে আছে মাত্র ৩ একর। এই জমিতে এখন ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ চলছে। দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও বস্তিবাসী উচ্ছেদ–সংক্রান্ত মামলার কারণে প্রকল্পটি কার্যত থমকে আছে।
ভাষানটেকের অনেক তাঁতি আবেদন ও জামানত দিয়েও কোনো প্লট পাননি। বেনারসি শাড়ির জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত তাঁতি মোহাম্মদ রফিক আক্ষেপ করে বলেন, “বেনারসিপল্লির শুধু নামটাই আছে। অনেক তাঁতি এখন রিকশা চালান, দোকান করেন।”
পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০০০–২০০৪ মেয়াদে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে বেনারসিপল্লি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ৫.৫ একর জমিতে ৯০টি প্লট থাকলেও অধিকাংশ প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও সবজি চাষ, কোথাও খেলাধুলা হচ্ছে। মাত্র দুটি কারখানায় ১৩টি তাঁত চালু রয়েছে।
প্রকল্পের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ জামাল জানান, কিস্তি অনিয়মের কারণে ১৪টি প্লটের বরাদ্দ বাতিল হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মূল বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছ থেকে প্লট কিনে বা ভাড়া নিয়ে অন্যরা তাঁত চালাচ্ছেন, যা প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০১৮ সালে শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরে প্রায় ১২০ একর জমিতে ‘তাঁত পল্লী’ স্থাপন প্রকল্প শুরু হয় (বর্তমানে নাম পরিবর্তন প্রক্রিয়াধীন)। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্প এলাকায় এখনো ধু ধু মাঠ, ঘাস আর কয়েকটি সাইনবোর্ড ছাড়া তেমন কিছু নেই। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি।
তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু আহমেদ ছিদ্দিক বলেন, মিরপুর প্রকল্পে চলমান মামলা এবং ঈশ্বরদীতে তাঁতিদের অনীহাসহ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে পুনর্বাসন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে তাঁতিরা বলছেন, সুযোগ–সুবিধা ও বাজারব্যবস্থা না থাকায় প্রকল্পগুলো আকর্ষণীয় হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে তাঁতির সংখ্যা ছিল ১০ লাখের বেশি, যা ২০১৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখে। আয় কম, মূলধনের অভাব এবং বাজার সংকটকে এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্প, অন্যদিকে পুনর্বাসনের অভাবে পেশা বদলাতে বাধ্য হওয়া তাঁতিরা—এই বৈপরীত্যই তুলে ধরছে তাঁত বোর্ডের পুনর্বাসন উদ্যোগের বাস্তব চিত্র। ভাষানটেক, ঈশ্বরদী কিংবা শরীয়তপুর–মাদারীপুর—কোথাও তাঁতিরা নিশ্চিত হতে পারছেন না, আদৌ তারা পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন কি না।
মন্তব্য করুন