দেখতে অনেকটা পাকা গাবের মতো, সুমিষ্ট ও রসালো এই ফলের নাম পার্সিমন। একসময় এটি বাংলাদেশের সাধারণ বাজারে খুব কম পাওয়া যেত, এজন্য ফল ব্যবসায়ীদের ভাষায় এটি ‘ধনীদের ফল’ নামে পরিচিত।
চট্টগ্রামের স্টেশন রোডে পাইকারি ফলের বড় আড়ত ফলমন্ডিতে দেখা গেছে, কয়েকটি আড়তে পার্সিমন বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানালেন, গত বছর পাইকারি দাম ছিল প্রতি কেজি ১,০০০–১,২০০ টাকা। এ বছর দাম নেমে এসেছে ৭২০–৭৮০ টাকায়। খুচরা বাজারে বর্তমানে কেজি ৮৫০–৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম। দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি বেড়েছে।
পার্সিমনের উৎসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি জাপানের জাতীয় ফল। জাপানে ‘কাকি’ নামে পরিচিত, যেখানে প্রায় এক হাজার বছর ধরে চাষ হয়ে আসছে। শরৎকালে কমলা রঙের পার্সিমন জাপানের কবিতা, চিত্রকলা ও গ্রামীণ উৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত। ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যসংকটের সময়ে শুকনা পার্সিমন বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
পুষ্টিগুণেও পার্সিমন গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা অনুযায়ী, এতে প্রচুর ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন এ ও সি, ক্যারোটিনয়েড, পলিফেনলস ও ট্যানিন রয়েছে। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রদাহ কমানো ও রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
চট্টগ্রামের ফল ব্যবসায়ী মেসার্স হাটহাজারী ফার্ম জানালেন, এবার ভারত থেকে বেশি পার্সিমন এসেছে। হিমাচল প্রদেশ, কাশ্মীর ও উত্তরাখণ্ডে উৎপাদিত ভারতীয় পার্সিমনের দাম কম। হাটহাজারী ফার্মে প্রতিদিন ৮০০ কেজি বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম ৮০০–৯০০ টাকা। চাহিদা বনেদি এলাকায় বেশি হলেও, এখন হাটহাজারী, পটিয়া ও বোয়ালখালীর দিকে সরবরাহ বাড়ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে মোট ৫৫ লাখ টন পার্সিমন উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে চীনের অংশ প্রায় ৪০ দশমিক ৬ লাখ টন। বাংলাদেশে পার্সিমন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪,৬৩০ কেজি এবং ২০২৫–২৬ সালে একই সময়ে ১,৮২,৬৩৬ কেজিতে পৌঁছেছে, মূলত ভারত থেকে আমদানির কারণে দাম কমেছে।
দেশে এখনো সরকারি বা বাণিজ্যিকভাবে পার্সিমনের চাষ সীমিত। যশোর ও বান্দরবানে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হয়েছে। দেশের আবহাওয়া ও মাটি কিছু প্রজাতির জন্য উপযোগী হলেও, মূল সমস্যা হলো উন্নত মানের চারা পাওয়া। ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে ভালো মানের চারা আনা গেলে দেশে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
পার্সিমন সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে, দাম কমায় চাহিদা বেড়েছে, তবে দেশের উৎপাদন না থাকায় এখনও মূলত আমদানির উপর নির্ভরশীল।
মন্তব্য করুন