২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনপূর্ণ ও অবিশ্বাসে ভরা। সে সময় ইসলামাবাদকে তালেবানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দেখা হতো, দেশটির রাজনৈতিক অবস্থান ছিল প্রশ্নবিদ্ধ এবং কূটনৈতিকভাবে তারা প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে জিডিপিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি এলেও পাকিস্তানের অর্থনীতি তখনো ব্যাপকভাবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে পাকিস্তান ছিল অবিশ্বস্ত এবং কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। দেশটির শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে মনে করা হতো রহস্যময় ও দ্বিমুখী ভূমিকার অধিকারী, যারা সন্ত্রাস দমনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনাগ্রহী। বিশ্লেষকেরা তখন সতর্ক করেছিলেন, পাকিস্তান এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে।
কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে চিত্রটি পুরোপুরি বদলে গেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রান্তিক দেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে পাকিস্তান এখন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারাও পাকিস্তান নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ প্রায়ই চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ‘সমুদ্রের চেয়ে গভীর ও পাহাড়ের চেয়ে উঁচু’ বলে বর্ণনা করত।
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট মহলে তখন প্রত্যাশা ছিল—ভারতের প্রতি সমর্থন জোরদার করা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোয়াড জোটকে শক্তিশালী করা এবং ভারতের স্বার্থের অনুকূলে পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে এক পাশে রাখা।
তবে ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই নীতির মধ্যেই ওয়াশিংটনের ভেতরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং সামরিক সক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন এসব বিষয় উপেক্ষিত থাকলেও, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভারতের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ধীরে ধীরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান সম্পর্কে বরফ গলার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের মধ্যে গোপন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে। এতে স্পষ্ট হয়, ইসলামাবাদ কার্যকর সহযোগিতায় আগ্রহী। এরপর চলতি বছরের মার্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে হঠাৎ করেই পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন প্রচেষ্টার প্রশংসা করলে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নীতির বাইরে গিয়ে ট্রাম্পের এই অবস্থান ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘ডিসি ব্লব’-কে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়। ট্রাম্পের নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তান এখন আর সন্দেহের চোখে দেখা কোনো দেশ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন ও শক্তিশালী কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন