Tanvir Khan
প্রকাশ : Dec 5, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সেন্ট মার্টিনের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র: অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ও পর্যটনে ধ্বংসের মুখে অনন্য দ্বীপ

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল–বহনকারী দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আজ ভয়াবহ পরিবেশগত অবক্ষয়ের মুখে। সরকারি অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং অবৈধ নির্মাণ কয়েক দশক ধরে দ্বীপটির ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। বহুল প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দ্বীপটি প্রকৃত প্রবাল দ্বীপ নয়; বরং প্রবাল–সমৃদ্ধ একটি অনন্য পরিবেশ।

৩ হাজার মানুষ থেকে ১২ হাজার—দ্বীপের পরিবর্তনের গল্প

১৯৮০ সালে দ্বীপে বাসিন্দা ছিল মাত্র তিন হাজার। ছিল একটি নৌকাঘাট, কয়েকটি দোকান, একটি স্কুল ও কিছু মক্তব। আজ সেখানে জনসংখ্যা প্রায় ১২ হাজার এবং প্রতি বছর লাখো পর্যটকের আগমন দ্বীপের পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

পর্যটন–নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হোটেল, রিসোর্ট, সরকারি অফিস ও অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। দ্বীপের লেগুন, মিঠাপানির পুকুর, ম্যানগ্রোভ ঝোপ, প্রবাল–বোল্ডার এবং কেয়াগাছের সুরক্ষাবলয় ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।

অতিরিক্ত মাছ ধরা ও অনিয়ন্ত্রিত সংগ্রহে জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয়

অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে আশপাশের সমুদ্র প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁগুলোকে এখন মূল ভূখণ্ড থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে জীবিত প্রবাল, শামুক, ঝিনুক ও রঙিন সামুদ্রিক প্রাণী সংগ্রহও পরিবেশগত ক্ষতি বাড়িয়েছে।

মানব–বর্জ্যের ভয়াবহতা

দ্বীপের অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মানব–বর্জ্যের কারণে দূষিত হয়ে পড়ছে। শৌচাগারের বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক এবং নর্দমার জল খাদ্য ও পানির মূল উৎসে মিশে সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য–বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ধ্বংস ও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব

লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেয়াবনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ধ্বংস হওয়ায় ক্ষয়–সংকট আরও তীব্র হয়েছে।


নিষেধাজ্ঞায় পুনরুজ্জীবনের দৃশ্য

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসের পর্যটন নিষেধাজ্ঞা দ্বীপে পরিবেশগত পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। কেওড়া, অ্যাভিসেনিয়া, নিশিন্দা, ভাইটেক্সসহ স্থানীয় উদ্ভিদ দ্রুত পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। সৈকতে সৈনিক কাঁকড়ার সংখ্যা বেড়েছে এবং অলিভ রিডলে কচ্ছপের আগাম বাসা বাঁধা আশার আলো দেখিয়েছে। ছেঁড়াদিয়ার দক্ষিণাংশে প্রাকৃতিক বন গড়ে উঠেছে।

এই সবই প্রমাণ করে—মানুষের চাপ কমলেই সেন্ট মার্টিন নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে।


তবুও অবৈধতা বন্ধ নেই

অবৈধ নির্মাণ, হোটেলের উজ্জ্বল আলোতে কচ্ছপশিশুদের বিভ্রান্তি এবং জনবহুল কুকুরের উৎপাত—সবই দ্বীপের পুনরুদ্ধান বাধাগ্রস্ত করছে। কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির অভাব প্রকট।


যে পদক্ষেপগুলো জরুরি

বিশেষজ্ঞরা দ্বীপ রক্ষায় নিম্নোক্ত কাজগুলো জরুরি মনে করছেন:

পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

  • প্রতিদিন আবর্জনা সংগ্রহ ও সঠিক নিষ্পত্তি

  • সৈকতে মোটরচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ

  • কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা

  • সৌর শক্তি ও বৃষ্টির জল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা

  • ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন

  • নৌকা ও পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর নিয়মাবলি

  • স্থানীয়দের নিয়ে জীববৈচিত্র্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন

কঠোর নিয়ন্ত্রণ

  • দ্বীপজুড়ে কেওড়া ও নিশিন্দার বনের প্রাচীর তৈরি

  • লেগুনে নিয়মিত জোয়ার–প্রবাহ নিশ্চিত

  • তিনটি ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ ‘নো-গো জোন’ ঘোষণা

  • সমুদ্রসীমায় এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা নিষিদ্ধ

  • কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও অপসারণ

  • কচ্ছপ বাসাস্থল ২৪ ঘণ্টা নজরদারি

টেকসই পর্যটন

  • দৈনিক ২,০০০ দর্শনার্থীর সীমা বজায় রাখা

  • মার্চ–অক্টোবর দ্বীপ বন্ধ রাখা

  • রাতের আলো ও শব্দ নিষিদ্ধ

  • পলিথিন নিষিদ্ধ করে কাপড়/চটের ব্যাগ চালু

  • সৌরচালিত তিনচাকার যান ব্যবস্থাপনা


শেষ কথা: সেন্ট মার্টিনের জন্য এখনই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন

সেন্ট মার্টিন নিছক বিনোদনস্থল নয়—এটি বাংলাদেশের অনন্য পরিবেশগত ঐতিহ্য। সীমিত সময়ের এই সুযোগে বিজ্ঞানভিত্তিক স্থায়ী পরিকল্পনা নেওয়া না হলে ক্ষতি হবে অপূরণীয়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দ্বীপটি রক্ষা করবে, নাকি ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২০ মামলার আসামি নিহত, গুল

1

হাসিনা–জয়–পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ

2

সুদানে আরএসএফের গণহত্যায় আরব আমিরাতের ভূমিকা কেন প্রশ্নবিদ্ধ

3

ফুটবল বাছাইপর্বের ম্যাচ থেকে সংঘর্ষ: এল সালভাদর ও হন্ডুরাসের

4

সেন্ট মার্টিন ও হাতিয়ায় নৌপথে পণ্য পাচারের চেষ্টা, কোস্টগার্

5

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর নতুন এজলাস উদ্বোধন প্রধা

6

বৈভব সূর্যবংশীর ঝড়: ৩৬ বলে সেঞ্চুরি, লিস্ট এ ক্রিকেটে নতুন র

7

জিগাতলার ছাত্রী হোস্টেল থেকে এনসিপি নেত্রী জান্নাত আরা রুমির

8

আয়ারল্যান্ডকে উড়িয়ে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

9

পুলিশ লাইনের জন্য মোহাম্মদপুরের জলাধারের অংশ অধিগ্রহণে উদ্যো

10

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার নিয়ে জনমত বিভাজন: প্রথম আলোর জাত

11

তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা হয়নি: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্ট

12

সাঁতার প্রতিযোগিতার সেরা নাফিসা সিনেমায় নায়িকাও, নায়কের তালি

13

তীব্র খরায় তেহরানে দুই সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে সুপেয়

14

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সশস্ত্র ব

15

গুম সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ ২৩

16

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

17

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা: গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের শক্তিশা

18

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে

19

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, জানাজার দিনে

20